একটি খুনের অভিযোগ — পর্ব ১

#একটি_খুনের_অভিযোগ

মোঃ মিসাদ আলী

১ম পর্ব

.

.

সকাল আটটা,

একহাতে চা আর অপর হাতে ফোন নিয়ে ছাদে বসে অনলাইন পত্রিকাটায় চোখ বুলাচ্ছে আলফী। হঠাৎ যে এক শিরোনামে চোখ আঁটকে গেছে তার, সেটা নজর এড়ায় না তাসফিয়ার।

--'শিরোনামটা কী?' চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করে তাসফিয়া

--'গত রাতে এই পাশেই এক সাংবাদিক রফিকের ছোটো ভাই শফিককে খুন করা হয়েছে। রাত এগারটার নাগাদ তার লাশ পেয়েছে পুলিশ। ঘটনার পেছনে কার হাত রয়েছে তা এখনও আন্দাজ করতে পারছে না তারা। এদিকে রফিকও নিখোঁজ গতকাল থেকে।' ফোনের ফ্রেম থেকে চোখ না তুলেই বলতে থাকল আলফী 'ঘটনাস্থল থেকে একটা ঘড়ি উদ্ধার করেছে পুলিশ, ঘড়িটা যে রফিক কিংবা শফিকের নয় সেটা নিশ্চিত। পুলিশের ধারণা যখন তাকে হত্যা করা হচ্ছিল, ভুলক্রমে হত্যাকারির হাত থেকে পড়ে গেছে এটা।' এতটুকু পড়ার পর চোখ তুলল সে। চোখে তার ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।

--'এটা আবার তোমার ঘড়িটা নয়তো?' ভয়ের রেখা তাসফিয়ার চেহারায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। দুজনে চেয়ে রয়েছে দুজনের দিকে, যেন পরবর্তিতে কী ঘটতে চলেছে তা তাদের চোখের সামনে ভাসছে।

--'আম্মু, প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। আর সময়ও হয়ে যাচ্ছে, স্কুল বাস আসার। কী খাবার করেছ?' তাদের সাত বছর বয়সী মেয়ে ইশরা ছাদে এসে বলল

--'আজকে তো খিঁচুড়ী রান্না করেছি, তোমার ফেভারিট না?' মুখে কৃত্তিম হাসি আনার চেষ্টা করে বলল তাসফিয়া

--'চলো তাড়াতাড়ি, নইলে আমার দেরি হয়ে যাবে। আব্বু চলেন, সবসময় ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখের সমস্যা হবে।' ফোনটা আলফীর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলল সে

--'হুম, চলো আম্মু। আমারো প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে।' উঠে দাঁড়িয়ে বলল আলফী

.

তিনজনে ছাদ থেকে নেমে এসে খাবার টেবিলে বসেছে, এমন সময় কে যেন দরজায় নক করল। তাসফিয়া যাচ্ছিল দরজা খুলতে, কিন্তু আলফী তাকে বাধা দিয়ে নিজেই গেল। দরজা খুলে দেখে কয়েকজন ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছে।

--'আবিদ আলফী মিসাদ?' কথাটা বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল তাদের মধ্যের একজন

--'জ্বী, আমিই আবিদ আলফী মিসাদ। কী হয়েছে?'

--'আপনাকে একটু কষ্ট করে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে। শফিক হত্যা মামলায় আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার ছিল।

--'আচ্ছা চলুন।' বলেই একবার পেছনে তাকালে দেখল, ইশরা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে আর তাসফিয়ার চোখের অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে কপল বেয়ে।

গাড়ি এসে থামল সোজা পুলিশ স্টেশনে, নেমে এলো আলফী। ভেতরে গিয়ে একটা ফাঁকা রুমে চেয়ারে বসতে বলল তাকে। ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের কর্মকর্তাগুলো চলে গেল রুম থেকে। একটা মূহুর্তের জন্য পুরো রুমটা নিস্তব্ধতা ছেয়ে গিয়েছিল, সেই নিস্তব্ধতা কাটিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন অফিসার-ইন-চার্জ আয়ান আহমেদ। তিনি আলফীর দিকে এগিয়ে এসে সামনের চেয়ারটায় বসলেন।

--'আচ্ছা মিস্টার আলফী, আপনি কী কাজ করেন?' আলফীর দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে প্রশ্ন করলেন তিনি

--'একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে জব করি।'

--'ওহ গ্রেট। তা ফ্যামিলি মেম্বার কতজন?

--'আমার মনে হয় না, এই প্রশ্নটা আপনাকে কেসের ব্যপারে তেমন একটা সাহায্য করবে। আমি, আমার স্ত্রী তাসফিয়া তানহা ঝুম আর সাত বছরের মেয়ে মাহদিয়া জান্নাত ইশরা, এই তিনজনের ছোট্ট পরিবার আমাদের।'

--'তাহলে বলুন, গতকাল রাত দশটার নাগাদ আপনি কোথায় ছিলেন।' আলফীর দিকে কড়া নজর রেখে বললেন তিনি

--'গতকাল রাত দশটায় আমি আমার রুমেই ছিলাম।' কোনরকম বিচলিত না হয়েই বলল আলফী

--'তাহলে আপনার ঘড়িটা কীভাবে শফিকের লাশের পাশে গেল? পায়ে হেঁটে?' হালকা হেসে বললেন আয়ান আহমেদ, তবে রাগে তার চোখ লাল হয়ে গেছে।

--'আমি গতকাল রাত সাড়ে আটটার নাগাদ যখন বাসায় ফিরছিলাম, তখন কারো সাথে ধাক্কা লাগে। আর ওখানেই পড়ে যায় ঘড়িটা। সারাদিনের কাজের চাপের ফলে অনেক ক্লান্ত ছিলাম, তাই বুঝতে পারিনি বিষয়টা। বাসায় ফিরে তাসফিয়াই প্রথমে লক্ষ্য করে আমার হাতে ঘড়ি নেই।' বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে না গিয়ে বলল আলফী

--'ভালোই গল্প বানিয়েছেন দেখছি। আপনার কি মনেহয়, এখানে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলার জন্য আপনাকে ডাকা হয়েছে?' রাগটা এতক্ষণে প্রকাশ পেয়েছে, মাংস পেশি টানটান হয়ে উঠেছে।

--'আমি মোটেও গল্প বলছি না। এগুলোই সত্য।' একটু জোর দিয়েই বলল আলফী

--'আপনার কাছে কি কোন প্রমাণ আছে যে আপনি হত্যাটা করেননি?'

আলফী কিছু বলতে যাবে ঠিক এমন সময় আয়ান আহমেদের ফোন বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বাইরে চলে গেল সে। কিছুক্ষণ পরেই আবার ভেতরে এসে আলফীকে বলল,

--'আপনি এখন যেতে পারেন, পরবর্তীতে যদি প্রয়োজন পড়ে তবে আবার আসতে হবে।'

আলফী কিছু না বলে শুধু হালকা হাসি দিয়ে বিদায় নিলো পুলিশ স্টেশন থেকে।

বাসায় ফিরে দেখে তাসফিয়ার রক্ত লাল বর্ণ ধারণ করা চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে অঝর ধারায়। তবে ইশরা বাসায় নেই, হয়তো স্কুলে গেছে।

--'এই পাগলী, এভাবে কাঁদছ কেন?' তাসফিয়ার পাশে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল আলফী

--'ওরা ইশরাকে তুলে নিয়ে গেছে।' আলফীকে দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল সে

--'কারা নিয়ে গেছে? কোথায় নিয়ে গেছে?' আলফীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তার একমাত্র আদরের পিচ্চি মেয়েটাকে কারা তুলে নিয়ে গেল?

--'জানি না ওরা কারা ছিল। তবে ওদের মধ্যে একজন বলেছে, তুমি ফিরে আসলে যেন বলে দিই তোমাকে যা বলেছে তা না করলে ওরা আমাদের মেয়েকে জীবিত রাখবে না।'

কান্না থামাতে পারছে না তাসফিয়া। আলফীরও চোখ কখন ভিজে এসেছে ও বুঝতেই পারেনি।

--'ওরা কারা ছিল আলফী? আর তোমাকে কী কাজ করতে বলেছে?' আবার প্রশ্ন করল তাসফিয়া

--'রুমন মাস্তানের লোক।' কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে থাকল সে 'রুমন মাস্তান অস্ত্র আর কোকেইন বিক্রি করে গোপনে। আমাকে সে প্রস্তাব দিয়েছিল, ওগুলো তাদের কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দিলে অনেক টাকা দিবে সে। কিন্তু আমি এসবের সাথে যুক্ত হতে চাইছিলাম না, তাই তারা এসব করছে।'

--'কিন্তু এইসব তোমাকে দিয়েই কেন করাতে চায় সে?' এতক্ষণ কান্নার ফলে কন্ঠটা ভারি শোনাচ্ছে তার।

--'কারণ এসব বাইরের কাউকে দিয়ে করানো প্রচুর ঝুঁকির কাজ। আর আমার সাথে অনেকদিন থেকে পরিচিত রুমন, তাই কাজটা আমাকেই করতে বলে সে।'

--'তুমি যেভাবেই হোক আমার ইশরাকে আমার কাছে ফিরিয়ে এনে দাও।'

--'চিন্তা করো না। আমাদের ইশরার কিছু হবে না।' আলিঙ্গন করে বলল আলফী

তারপরেই পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাকে যেন ফোন করতে করতে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে।

.

.

[][][][][] চলবে... [][][][][]

একটি খুনের অভিযোগ — সব পর্ব

মন্তব্যসমূহ