#একটি_খুনের_অভিযোগ
মোঃ মিসাদ আলী
২য় পর্ব
.
.
আলফী ফোন করতে করতে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।
--'হ্যাঁ আলফী বল' ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো
--'শাহিন, তুই কোথায় আছিস?' উদ্দিগ্ন কন্ঠে বলল আলফী
--'আমি বাসাতেই আছি। কেন? কী হয়েছে? কোন বিপদে পড়েছিস নাকি?'
--'বিপদে তো কিছুটা পড়েছিই। তুই কি ফ্রি আছিস? দেখা করতে পারবি একবার?'
--'কোথায় আসতে হবে বল।'
--'সেই নদীপাড়ের কাছে, যেখানে আমরা আড্ডা দিতাম রোজ।'
--'আচ্ছা দাঁড়া, আমি দশ মিনিটের মধ্যে আসছি।' বলেই ফোনটা রেখে দিয়ে বাসা থেকে বের হলো শাহিন।
আলফী বসে আছে আর অপেক্ষা করছে শাহিনের। বেলা কিছুটা গড়িয়েছে, চৈত্রের সূর্যের তাপমাত্রাও বাড়ছে ধীরে ধীরে। তবে হালকা ঝড়ো হাওয়া বইছে, তাই গরমের অনুভবটা তেমন নেই। তাছাড়া নদীর পাড়ে নদীর শীতল বাতাসে মন জুড়িয়ে যাবার কথা, কিন্তু আলফীর মনকে শীতল করতে আজ বাতাস ব্যর্থ।
পেছন থেকে কেউ কাঁধে হাত রাখায় চমকে উঠল আলফী। পেছনে ঘুরে দেখে দাঁড়িয়ে আছে শাহিন।
--'কী হয়েছে তোর? এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন তোকে?' আলফীর মুখের দিকে একবার তাকিয়েই প্রশ্ন করল শাহিন
--'দোস্ত, তোকে বলেছিলাম না রুমনের কথা?'
--'সে কি তোকে আবার ওসব করার জন্য বলছে? কিংবা তোকে কি কোন প্রকার চাপ দিচ্ছে ওসবের জন্য? বল, এরকম কিছু করলে ব্যটাকে সাইজ করে দিব।' রাগান্বিত কন্ঠে বলল সে
--'ইশরাকে তুলে নিয়ে গেছে তার লোক।' বলেই মাথাটা নিচু করে নিল সে, চোখ ভিজে মাটিতে পড়ছে অশ্রুবিন্দু
--'কী বলিস এইসব! তুই বাধা দিসনি কেন?'
--'আমি তখন পুলিশ স্টেশনে ছিলাম...' শাহিনকে সব খুলে বলে আলফী
--'এক্ষুণি চল, দিন দিন রুমনের অত্যাচার বেড়েই চলেছে। তাকে একটা শিক্ষা দিতেই হবে এবার।' উঠে দাঁড়িয়ে আলফীর হাত ধরে টান দেয়, কিন্তু আলফী নড়ে না তাই আবার বলে 'কী হলো? চল।'
--'ওদের সাথে লড়াই করতে পারবি না। ওর হাত অনেক দূর পর্যন্ত আছে। আমরা যখন একসঙ্গে কাজ করতাম, তখন যা ছিল এখন তেমন নেই। অনেক বড়ো মাপের মাস্তান সে। এমনকি আন্ডার ওয়ার্ল্ডের মাফিয়ার সাথেও তার যোগসূত্র আছে।'
--'কী! মাত্র একবছরে এতকিছু হয়ে গেছে?' একটু আশ্চর্যই হয় শাহিন, তার চোখের সামনে ভেসে আসে সেই দূর্ঘটনা, সেই আগের দিনগুলো।
পাঁচ বছর আগে,
আলফী, শাহিন আর রুমন তিনজন বেষ্ট ফ্রেন্ড। তিনজনই এলাকার মানুষের মনে ভয়কে বাসা বাঁধাতে সক্ষম হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে জ্যন্ত রাখে না তারা। তারা তিন দেহে এক প্রাণ বলা যায়, এমন তাদের বন্ধুত্ব।
ধীরে ধীরে আরো কিছু ছেলে এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিলে তাদের দল বড়ো হতে থাকে। কিন্তু এমনিতেই যা-ই করুক না কেন, ভালো মানুষদের কখনো অনিষ্ট করার চিন্তাও করতো না তারা।
একদিন আলফী আর শাহিন গিয়েছিল মহিলা কলেজের অধ্যক্ষকে হুমকি দিতে। অধ্যক্ষকে হুমকি দেবার কারণ, সে একটা মেয়েকে পরীক্ষায় অ্যটেন্ড করতে দেয়নি। যদিও মেয়েটা যথেষ্ট মেধাবী ছিল, কিন্তু কোন এক কারণে তার টেস্ট পরীক্ষা খারাপ হয় এবং সে ফেল করে। মেয়েটা অনেকবার অধ্যক্ষকে অনুরোধ করে ব্যর্থ হলে বাসায় ফিরে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। মেয়েটার মা গিয়েছিল শাহিনের কাছে, তাই তারা উপস্থিত মহিলা কলেজে।
এক মেয়েকে অধ্যক্ষের রুম কোথায় জিজ্ঞাসা করলে দেখিয়ে দেয় রুমটা। দুজনে ভেতরে প্রবেশ করে।
--'তোমরা কারা? তোমাদের কি কমন সেন্স বলে কিছু নেই? কারো রুমে প্রবেশ করলে যে নক করে প্রবেশ করতে হয় তা কি তোমাদের শেখায়নি কেউ?' রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন মি. সুবীর
--'ও আচ্ছা, কারো রুমে প্রবেশ করলে নক করে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু একজন মেধাবী ছাত্রী শুধুমাত্র টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে তাকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয় না, তার আগের ফলাফল না দেখে। কমন সেন্স শেখাও আমাদের *****!' একটা বিশ্রী গালি দেয় শাহিন
--'কী বলছ এসব? কার আগের ফলাফল না দেখে পরীক্ষা দিতে দিচ্ছি না?' ভয়ে দমে গেছে সে, আমতা আমতা করে কথাগুলো বলল
--'নিধীর আগের ফলাফলগুলো দেখাবেন প্লিজ।' শান্ত কন্ঠে বলল আলফী
আলফীর এই এক গুন, যা-ই হয়ে যাক নিজেকে শান্ত রেখে চিন্তা করে সে।
--'আমি তোমাদের কেন দেখাব?'
অধ্যাক্ষ সুবীরের কথা শুনে পিস্তলটা সামনে এনে টেবিলের ওপর রাখল দুজনে।
--'আগের ফলাফল তো এখানে নেই, আরেকটা রুমে আছে।' পিস্তল দেখে ভয় পেয়ে বলল সুবীর
--'ঐ রুম থেকে কি ফলাফল দেখা যাবে না? না-কি রুমে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আছে আমাদের জন্য?' রেগে বলল শাহিন
--'তোমরা হয়তো বুঝছো না, এটা একটা মহিলা কলেজ। আর মহিলা কলেজে সব রুমে প্রবেশ করা বারণ ছেলেদের জন্য।'
--'তো? কোন মেয়ে স্টাফ নেই কলেজে? তাকে দিয়ে নিয়ে আসা যাবে না?'
--'আসলে আজকে আমাদের পিয়ন আসেনি। তাই...'
--'ওসব বলে লাভ নেই। চাবি দিন আমাকে।' ধমকের সুরে বলল শাহিন
কিছু বলতে গিয়েও আঁটকে গিয়ে চাবিটা বাড়িয়ে দিলো।
--'২৭ নম্বর রুমের ৩২ নম্বর লকার।'
.
চাবি নিয়ে রুম থেকে বের হলো দু'জন। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করে শেষে ২৭ নম্বর রুমের সামনে দাঁড়াল তারা। রুমের দরজার ওপরে স্টিলের পাতের ওপর রং দিয়ে লেখা, রুম নম্বর ২৭, মনোবিজ্ঞান। লেখাটা পড়ে নক করল শাহিন। রুম থেকে কয়েকজন বেরিয়ে এলো, তাদের মধ্যেই একজন বলল,
--'এখানে কী চাই?'
--'আমরা লকার থেকে গত কয়েক পরীক্ষার ফলাফল শীটটা নিতে এসেছি।' শাহিনের দিকে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে এসে বলল আলফী
শাহিন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। কোন কথা যে তার কান অবদি পৌঁছাচ্ছে না তা নিশ্চিত।
.
আলফী হালকা ধাক্কা দেয় শাহিনকে।
--'কী ভাবছিস এতক্ষণ থেকে?'
--'কিছু না, তা এখন কী করবি তাহলে?' ভাবনার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এসে বলে শাহিন
--'রুমনের কথা শোনা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় তো দেখছি না।'
--'কী বলিস এইসব? তুই আবার সেই পথে যাবি?' অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে শাহিন
--'তো? কী করতে পারি আমি? আমি একাজ না করলে ওরা আমার মেয়েকে মেরে ফেলবে।'
--'তাই বলে বাকি সবার জীবন নিয়ে..'
--'আমি না করলে কি অন্য কারো দ্বারা এটা করাবে না রুমন?' শাহিনকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করে আলফী
--'তাই বলে তুই করবি?'
--'আমি আমার মেয়েকে ফেরত পেলে চলে যাবো দূরে কোথাও। আসলে আমার আবার ফিরে আসাটাই ঠিক হয়নি। মাত্র একমাস আগে ফিরে এসেছি, এখন আমার মেয়েকে হারাতে বসেছি। আমার আর থাকা হবে না এখানে, চলে যাবো।' বলেই হাঁটা শুরু করল আলফী
--'আলফী দাঁড়া, আলফী, আলফী...' পেছন থেকে ডেকে চলল শাহিন
.
.
.
[][][][][] চলবে... [][][][][]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন