একটি খুনের অভিযোগ — পর্ব ৩

#একটি_খুনের_অভিযোগ

মোঃ মিসাদ আলী

৩য় পর্ব

.

.

শাহিনের ডাকে একবার পেছনে ফিরে তাকালেও ফিরে এলো না আলফী। শাহিন সেখানেই বসে রইল, অতীতের স্মৃতিগুলো বারবার হাতছানি দিচ্ছে তাকে।

.

--'কিন্তু আপনারা কারা? আপনারা কেন ফলাফল শীট নিবেন?' অবাক হয়ে প্রশ্ন করল মেয়েটি

--'তোমাদের অধ্যক্ষ আমাদের অনুমতি এবং চাবি দুটোই দিয়েছে। আর আমার মনে হয় না, কেন নিব সে কৈফিয়ত তোমাকে দিতে হবে। এখন আপাতত রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ালে খুশি হবো।' বলল আলফী

আলফীর কথা শুনে সবাই সরে গেল প্রবেশ পথ থেকে। আলফী শাহিনের হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে গেল। এতকিছুর পরও শাহিন শুধু মেয়েটার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। আলফী শাহিনের হাত থেকে চাবিটা নিয়ে লকার খুলল। লকারের ভেতরে অনেক ফাইল, তার ভেতর থেকে নিধীর ফাইলটা বের করল। ফাইলের ভেতরেই রাখা আছে আগের পরীক্ষাগুলোর ফলাফল আর টেস্ট পরীক্ষার খাতা। লকার খোলার সময় মেয়েগুলো একে অন্যের সাথে কী একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। তাদের কিছু কথা আলফীর কান অবদি পৌঁছালো। সে ফাইলটা নিয়ে শাহিনের হাত ধরে টেনে বের হলো রুম থেকে। বারবার শাহিন পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে।

--'কী রে? কী হয়েছে তোর?' শাহিনকে জিজ্ঞাসা করে আলফী

--'কই? কী আবার হবে? কিছু না।'

--'তাহলে মেয়েটার দিকে এমন করে তাকিয়েছিলি কেন?'

--'মেয়েটা কী মায়াবী! তাই না?'

--'বাব্বাহ্, আজকাল মেয়েদের দিকেও তাকাচ্ছিস দেখি, তার ওপর আবার মন্তব্যও করছিস মেয়েদের নিয়ে।' হালকা হেসে বলল আলফী

--'ঐ সালা, আমি মেয়েদের দিকে তাকাচ্ছি মানে? আর মেয়েদের নিয়ে মন্তব্য করছি বলতে কী বোঝাচ্ছিস?' খানিকটা রেগে বলতে থাকে শাহিন 'আমি তো একটা মেয়ের দিকেই তাকিয়েছি শুধু, আর মন্তব্যটাও তাকে নিয়েই করলাম। এখানে মেয়েদের বলে আমার চরিত্রে দাগ কেন ফেলছিস?'

--'ও আচ্ছা, তুই তাহলে একটা মেয়ের দিকেই তাকাস। তা ঘটনা কী?'

--'মেয়েটাকে প্রচন্ড ভালো লেগে গেছে রে।'

--'খোঁজ লাগাবো না-কি মেয়েটার ব্যপারে?'

--'অবশ্যই, সে আবার বলতে হবে না-কি?'

কথা বলতে বলতে তারা অধ্যক্ষের রুমের সামনে চলে এসেছে।

--'শুনলাম কেউ না-কি আমার ব্যপারে খোঁজ লাগাবে? তা কী কী জানতে চায় সে?' পেছন থেকে হঠাৎ বলে ওঠে মেয়েটা

মেয়েটার এমন কথায় চমকে ওঠে দু'জনেই। শাহিনের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে কয়েকগুন, কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না সে।

--'কী হলো? বলুন' কোন উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন করে মেয়েটা

--'সবকিছু, তোমার সমন্ধে সবকিছু জানতে চাই।' অবশেষে কথা বলে শাহিন

--'সবকিছু জানতে চান?' ভ্রু কুঁচকে বলে মেয়েটা 'কিন্তু কেন?'

--'সেটা তুমি জানতে পারবে তখন, যখন তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু আমার ধারণা থাকবে।'

--'আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি অপেক্ষায় রইলাম। আমার নাম সুবর্ণা, এবার দ্বাদশ শ্রেণিতে কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার্থী নই।'

--'তারমানে নতুন দ্বাদশ শ্রেণি?'

--'জ্বী নতুন দ্বাদশ শ্রেণি। আমার বাবার নাম সুবির, যিনি এই কলেজেরই অধ্যক্ষ। বাবা-মার একমাত্র মেয়ে আমি...' বলতে থাকে সুবর্ণা, কিন্তু হঠাৎ মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছে শাহিন।

শাহিনের ভাবনায় ঘিরে ধরেছে ভয়, অধ্যক্ষ'এর সাথে এভাবে কথা বলেছে আর গালিও দিয়েছে। আর তার ওপর আবার শাহিন একজন নামকরা মাস্তান। তার সাথে কি সুবর্ণার মিলন আদ্যোও সম্ভব? এটা কোন মা-বাবাই মেনে নিবে না যে তার মেয়ের বিয়ে একটা মাস্তানের সাথে হোক। আর যদি আসে সুবির সাহেবের কথা, তবে তো কোনমতেই সম্ভব নয়।

--'কী রে? আবার কোথায় হারিয়ে গেছিস?' হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে আলফী। আলফীর ধাক্কার ফলে ভাবনার জগৎ থেকে বাইরে এসে বলে শাহিন

--'না, কোথাও না। যে কারণে এখানে আসা, তা আগে সম্পন্ন করি।' এবার সুবর্ণার দিকে তাকি বলে 'আর তোমার সম্পর্কে বাকিটা পরে জানবো, আজকের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।'

তারা দুজনেই প্রবেশ করে অধ্যক্ষের কক্ষে। আলফী চেয়ারে বসতে বসতে ফাইলটা এগিয়ে দেয় অধ্যক্ষের দিকে।

--'যে বিষয়টায় ফেল করিয়েছেন নিধীকে, সে বিষয়ের পরীক্ষার খাতাটা একবার পূণর্মূল্যয়ন করে দেখবেন প্লিজ।'

সুবীর সাহেব খাতাটা বের করে ফাইল থেকে। সঙ্গে সঙ্গে খাতাটা নিজ হাতে লুফে নেয় আলফী। নাম্বারের দিকে চোখ যায় তার,

--'৩২, মাত্র ১ মার্কের জন্য ফেইল করেছে সে।' বলেই অধ্যক্ষের দিকে তাকায় সে। তার চোখে রাগ না-কি অন্যকিছু তা বুঝে আসে না মিস্টার সুবীর সাহেবের।

খাতাটা উল্টাতে শুরু করে, দেখে সব সঠিক উত্তরগুলোতেও ক্রশ চিহ্ন আঁকা। চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরে রাগে, খাতাটা ছুড়ে মারে সুবীর সাহেবের মুখের ওপর।

--'তাকে ডাকুন' গরগর করে বলল সে, অধ্যক্ষ বুঝে গেছে কাকে ডাকার কথা বলেছে। চুপচাপ ফোনটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে ফোন দিল তাকে।

কিছুক্ষণ পর রুমে প্রবেশ করল একজন ৩০-৩২ বছর বয়সি ভদ্রলোক। তাকে দেখে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো আলফী, এগিয়ে গেল তার দিকে। হাতটা ওপর তোলার পর সরাসরি নেমে এলো তার গালের ওপর। আলফীর হঠাৎ এমন ব্যবহারে অধ্যক্ষ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এ যেন সম্পূর্ন ভিন্ন এক আলফী, আগের সেই নম্র-ভদ্র আলফী নয়।

--'আজ তুই তোর পেশার কারণে বেঁচে গেলি, অন্য কেউ হলে তার দেহ নিস্প্রাণ পড়ে থাকতো।' কলার ধরে টেনে টেবিলের ওপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলতে থাকল সে 'একজন শিক্ষককে তার শিক্ষার্থীদের কাছে অভিভাবকের মতো হওয়া উচিৎ। বর্তমানে তোর মতো কিছু দুশ্চরিত্রবান মানুষের কারণে এই মহান পেশা যাদের কাজ শিক্ষা দেওয়া, জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা সেই পেশায় কলংকের ছাপ পড়ছে প্রতিনিয়ত। ভাবতেও অবাক লাগে, কীভাবে একটা শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর সাথে এমন করতে পারে? এরা কি শিক্ষক হবার যোগ্য? শিক্ষার আলো কি এদের অন্তরকে বিন্দুমাত্র আলোকিত করতে পেরেছে?' কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে থামলো আলফী। তার চোখ যে রাগে লাল বর্ণ ধারণ করেছে তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শাহিন।

--'ঘটনা কী আলফী? কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না। কী হয়েছে?' আলফীর কাঁধে হাত রেখে প্রশ্ন করল সে। আলফী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে শুরু করল...

.

.

[][][][][] চলবে... [][][][][]

একটি খুনের অভিযোগ — সব পর্ব

মন্তব্যসমূহ