সারপ্রাইজ ম্যারেজ — পর্ব ৯

#সারপ্রাইজ_ম্যারেজ

MD Misad Ali

৯ম পর্ব/অন্তিম পর্ব

.

৮ম পর্বের লিংক:

https://mobile.facebook.com/diaryo.../posts/695264961113942/

.

ফজরের নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো আলফী। এক নির্জন পথে একা হেঁটে চলেছে সে, নিস্তব্ধতা চারিদিকে বিরাজমান। একটু পরেই ভোরের পাখির কুঞ্জন নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে দিলো। অনেক পাখি তার নীড় থেকে বেরিয়ে ছুটে চলেছে জীবন বাঁচার তাগিদে। ধীরে ধীরে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে আর রাতের অন্ধকারকে সরিয়ে ফেলল। ভোরের আলো ফুটতেই লোকজনের কোলাহল বেড়ে গেল চারিদিকে, আলফী বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। বাসায় ফিরে রিমঝিমের সাথে কথা বলছে আলফী।

-ভাইয়া, তোমার মতে জীবন কি?' কথা বলতে বলতে প্রশ্ন করল রিমঝিম

-আমার মতে জীবন হচ্ছে একটি খরশ্রোতা নদীর বুকে একটি ডিঙ্গি নৌকা। যে নদী বয়ে চলেছে অবিরাম, তার সাথে নিয়ে চলেছে আমাদের জীবনকে। যাতায়াত পথে আমরা পরিচিত হচ্ছি নতুন মুখ, নতুন জায়গা আর নতুন নতুন সব অভিজ্ঞতার সাথে। চলার পথে হয়তো নদীর বাঁকের মত কিছু জায়গায় এসে আমাদের জীবন মোড় নিচ্ছে ভিন্ন দিকে। যেমন পরিচিত হচ্ছি নতুন মানুষের সাথে, ঠিক তেমনি পরিচিত মানুষদের হারাচ্ছি ক্ষণে ক্ষণে। মানুষের জীবনে কিছু পরিস্থিতি আসে, যখন নদীর স্রোতের প্রতিকূলে দাঁড় বাইতে হয়। নদীর প্রখর স্রোতের প্রতিকূলে নৌকা চালানো কঠিন তবে অসম্ভব কিছু নয়। জীবন নামের নৌকা নিয়ে নদীতে চলার পথে অনেক বাধা আসবেই, কিন্তু সেই বাধা বিভিন্ন কৌশলে অতিক্রম করাই জীবন। আর এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাক্তিগত ধারণা, অন্য কারো কাছে এটা ভালোলাগতে নাও পারে।' বলল আলফী

-তাহলে তুমি এতদিন ওভাবে ঘরের কোনে ছিলে কেন?

-কারণ তখন সময় ছিল নদীর প্রতিকূলে দাড় বেয়ে এগিয়ে চলার, কিন্তু আমার তখন তেমন জোর ছিল না নদীর স্রোতকে হারানোর মত। একটা গাড়ি যেমন আঁটকে গেলে কিছু জায়গায় ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নিতে হয়, ঠিক তেমনি জারিফ আমাকে সাহায্য করলো জোর ফিরিয়ে আনতে।

.

বাসার সবাই মিলে নাস্তা শেষ করলো। জারিফ এসে সবকিছু ঠিক করে বুঝিয়ে দিল আলফীকে। আলফী তার বাইক নিয়ে ছুটল অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আলফী এখন কোথায় যাচ্ছে সেটা সে নিজেও জানে না। বাইক ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে মাঠের মধ্যের রাস্তা দিয়ে। রাস্তার দুই ধারের ধানের ক্ষেত, মাঝেমধ্যে বাগান, বাড়ি-ঘর, দোকান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ছুটে চলছে আলফী।

যেতে যেতে একটা লেকের পাসে দাঁড়াল আলফী। লেকের পানির রং নীল, ঠিক সাগরের পানির মত। লেকের পানিতে খেলা করছে একঝাক সাদা হাঁস, বক পাখি। লেকের পাড়ে উড়ে এসে বসছে বিভিন্ন ধরণের পাখি, পানির উপরে ফুটে আছে পদ্ম আর শাপলা। লেকটার পাড়ে পড়ে আছে অনেকগুলো বিভিন্ন রংয়ের বিভিন্ন আকৃতির পাথর। আলফী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এইসবকে ক্যামেরা বন্দি করে নিল।

সারাদিন শুধু বাইকেই কাটিয়ে দিল আলফী। রাত ১০টায় রাস্তার পাশে একটা মোটেল পেল, এবং সেখানে রাত্রী যাপনের সিদ্ধান্ত নিল। রাতের খাবার খেয়ে সে মোটের পিছনের এক নির্জন রাস্তায় হাঁটতে থাকল। চাঁদনী রাত, নির্জন রাস্তা, একা হেঁটে চলা এক অসাধারণ অনুভূতি অনুভব করলো আলফী।

কিছুক্ষণ পর মোটেলে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল আলফী। এভাবেই কাটতে থাকলো তার দিনগুলো।

দেড় মাস পরে বাসায় ফিরল আলফী। বাসায় ফিরে দেখে বাসায় কেউ নেই, শুধু জারিফ বসে আছে।

-আরে জারিফ, তুই এখানে। আব্বু-আম্মু আর রিমঝিম এরা সবাই কোথায়?' জারিফকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল আলফী

-ওনারা সবাই এক জায়গা গিয়েছেন, আমিও যেতাম কিন্তু তোর জন্যই বসে আছি। নে তুই তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।' আলফীর দিকে একটা নীল রংয়ের পাঞ্জাবী এগিয়ে দিয়ে বলল জারিফ

-কিন্তু কোথায় যাবো? কেনো যাবো? আমায় বলবি তো আগে।

-সেটা তো গেলেই দেখতে পাবি। নে আর দেরি করিস না, এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে অনেক।

.

আলফী রেডি হয়ে আসলে জারিফ তাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো বাসা থেকে। তারা বাইকে করে এগিয়ে চলেছে, হঠাৎ একটা বাড়ির নিচে এসে গাড়ি ব্রেক করল জারিফ। জারিফ আর আলফী বাড়িটার ভিতরে প্রবেশ করল, ভিতরে আলফীর বাবা-মা আর রিমঝিম বসেছিল।

-কি হয়েছে আম্মু, তোমরা এখানে কি করছো? আর এটা কার বাসা?' জিজ্ঞাসা করল আলফী

-কি ব্যাপার জারিফ, আলফীকে তুমি কিছুই বলনি নাকি?' জিজ্ঞাসা করলেন আলফীর আম্মু

-না আন্টি, ভাবলাম একেবারে শেষ সময়েই বলবো। আলফী তো আবার সারপ্রাইজ খুব পছন্দ করে।

-কিসের সারপ্রাইজ? হয়েছে টা কি? কেউ কি আমাকে কিছু বলবে?

-ধৈর্য্য হারাচ্ছিস কেনো? জানিস না ধৈর্যের ফল সবসময় মিস্টিই হয়।

.

আলফী চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, কিছু বলছে না সে। এমন সময় বাসায় প্রবেশ করলো কাজী।

-এই জারিফ, কার বিয়ে রে?' কাজী কে দেখে জিজ্ঞাসা করল আলফী

-কার আবার, তোর।

-ফান করিস না, সিরিয়াসলি বল না. কার বিয়ে?

-আমি তো সিরিয়াসলিই বলছি, তোর বিয়ে।

-আমার বিয়ে মানে? আমার বিয়ে আর আমিই জানি না? কি বলছিস এগুলো?' অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল আলফী

-সারপ্রাইজ,,, তুই তো সারাপ্রাইজ ভিষণ পছন্দ করিস, তাই ভাবলাম সারপ্রাইজ দিবো তোকে।

-মানে টা কি? আমার বিয়েতে আমাকে সারপ্রাইজ! যাক, তাও বলিস নি বিয়ে হয়ে গেছে। আর আমি এই বিয়ে করছি না।' একটু রেগেই বলল আলফী

-তুই বিয়ে করবি না মানে?

-যাকে চিনি না, যার সম্পর্কে জানি না, যাকে কোনোদিন দেখিই নি। তাকে বিয়ে করি কিভাবে বলতো? তাছাড়া আমি ওর নাম পর্যন্ত জানি না।

-ওর নাম তাসফিয়া তানহা ঝুম।

-নাম যা পারবে হোক। আমি এই বিয়ে করছি না, ব্যাস।

-তুই কি আঙ্কেলকে ওনাদের সামনে ছোটো করতে চাস?

-কিন্তু আমি তো কোনো কাজই করি না, বিয়ে করে খাওয়াব কি?

-রিজিকের মালিক তো আল্লাহ্। তোকে এতো টেনশন করতে হবে না।

-বুঝেছি, সবই তোর করা পরিকল্পনা। আমাকে আগে বলে নি, যাতে আমি বিয়েতে না করতে না পারি।

-এই তো বুঝে গেছিস, আর জীবনসঙ্গীর সম্পর্ক জানতে বিয়ের পর সারা জীবন তো পড়েই আছে।

-ও কি আমার সম্পর্কে যানে সবকিছু?

-সবকিছু না জানলেও, অনেক কিছুই জানে। রিমঝিম তোর সম্পর্কে অনেক কিছুই বলেছে ঝুমকে।

.

অবশেষে বিয়েটা সম্পন্ন হলো। জারিফ, আলফীর বাব-মা, রিমঝিম, সবাই আলফীর দিকে তাকিয়ে হাঁসছে। আজ আলফী যেনো খাচার ভিতর বন্দি হয়ে গেল।

নব-বধুকে রেখে যাবে নাকি নিয়ে যাবে এটা নিয়ে কথা উঠতেই আলফী রেখে যাওয়ার কথা বলল। বিয়ের পরের প্রেমের আলাদা শক্তি আছে। বিয়ে হয়ে গেলেও একে অপরের সম্পর্কে জানার জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। তাই আলফী ভাবছে, ঝুমকে প্রথমে তার প্রতি আকর্ষিত করবে তারপর প্রপোজ করবে। আর কিছুদিন প্রেম করার পর বাসায় নিয়ে যাবে।

আর সেই পরিকল্পনাতেই চলছে সবকিছু।

.

অতীতের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আলফী বাইক দাঁড় করাল সেই নীল পানির লেকের ধারে।

এবং প্রপোজ করলো তাসফিয়াকে।

.

.

তাদের বিবাহিত জীবন সুখের হোক। বিয়ের আগে প্রেম নয়, বিয়ের পরেই প্রেম করুন (নিজ নিজ স্বামী/স্ত্রীর সাথে)।

.

.

[][][][][] সমাপ্ত... [][][][][]

সারপ্রাইজ ম্যারেজ — সব পর্ব

মন্তব্যসমূহ