আবার সেই জঙ্গলে — পর্ব ৩

#আবার_সেই_জঙ্গলে

MD Misad Ali

৩য় পর্ব

.

২য় পর্বের লিংক:

https://mobile.facebook.com/diaryo.../posts/672494430057662/

.

প্রায় ৮ ঘন্টা পর প্লেন ল্যান্ড করলো রোমানিয়ার বুখারেস্ট এয়ারপোর্টে । তখন আমার ঘড়িতে সন্ধা ছয়টা বাজে কিন্তু এয়ারপোর্টের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে দুপুর দুইটা । লন্ডন থেকে বুখারেস্ট ৩০ ডিগ্রী পূর্বে অবস্থিত আর বাংলাদেশের অবস্থান লন্ডন থেকে ৯০ ডিগ্রী পূর্বে । যেহেতু গ্রীনিচের মানমন্দির (রয়েল অবজারভেটরি)-কে আন্তর্জাতিক সৌরসময় ০০ ধরা হয়, এবং প্রতি ১ ডিগ্রী পূর্বের স্থানের জন্য ৪ মিনিট সময় যোগ হয় আর প্রতি ১ ডিগ্রী পশ্চিমের স্থানের জন্য ৪ মিনিট সময় বিয়োগ করা হয় । প্রতিটি দেশের জন্য (এক দেশে একাধিকও হয়) নির্দিষ্ট একটা জিএমটি বা গ্রীনিচ মান সময় (Greenwich Mean Time) দেওয়া থাকে । ঢাকার জিএমটি +৬ অর্থাৎ গ্রীনিচ, লন্ডন, যুক্তরাজ্যের সময়ের সাথে ৬ ঘন্টা যোগ করতে হবে । যখন লন্ডনের সময় দুপুর ১২টা তখন ঢাকার সময় সন্ধা ৬টা । ঠিক তেমনি বুখারেস্ট, রোমানিয়ার জিএমটি +২, তাই এখন এখানে দুপুর ২ টা বাজছে । বুখারেস্ট এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে চলে এলাম বুখারেস্ট রেলওয়ে স্টেশনে । বুখারেস্ট থেকে সোজা ক্লাজ নাপোকা যাওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম ট্রেন । ট্রেনের টিকিট কেটে অপেক্ষা করতে শুরু করলাম, প্রায় ২০ মিনিট পর ট্রেন তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল । এখনো ৪৭৫ কিঃমিঃ পথ বাঁকি, যেতে প্রায় ৬ ঘন্টার মত লাগতে পারে । পাশের সিটে বসা একজন ভদ্রলোক অনেক্ষণ ধরে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো । হয়তো আমার সাথে কথা বলতে চায়ছে, অবশেষে সে বলেই ফেললো,

ভদ্রলোক- হ্যালো ইয়ংম্যান, আর ইউ বিজি ?

আমি- হ্যালো স্যার, নো আই এ্যাম ফ্রি, টেল মি ওয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ ?

ভদ্রলোক- হোয়্যার আর ইউ ফ্রম ?

আমি- আই এ্যাম ফ্রম সাউথ এসিয়া ।

ভদ্রলোক- ওয়াট, এশিয়া ! হুইচ কান্ট্রি আর ইউ ফ্রম ?

আমি- আই এ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ ।

ভদ্রলোক- কিহ্, তুমি বাংলাদেশ থেকে এসেছ !

আমি- আরে, আপনি বাংলায় কথা বলছেন । আপনিও কি বাঙ্গালী ?

ভদ্রলোক- নাহ্ আমি রোমানিয়্যান । কিন্তু বাংলা ভাষা কিছুটা বলতে পারি ।

আমি- ওয়াও, একজন রোমানিয়্যান হয়েও বাংলায় কথা বলতে পারেন । সত্যিই অস্বাধারণ ।

ভদ্রলোক- তোমাদের ভাষাটা আমায় একটু বেশিই আকর্ষণ করেছিলো । যখন জানতে পেরেছিলাম, বাঙ্গালীই পৃথিবীর বুকে একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে । তোমাদের ভাষার প্রতি এতো ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হয়ে শিখে ফেলেছি বাংলা ভাষা । তা তোমার নাম কি ? আর কি কারণে এখানে আসতে হয়েছে ?

আমি- আমি আরহাম জারিফ, আর এখানে এসেছি নতুন কিছু জানার উদ্দেশ্যে ।

ভদ্রলোক- তা ভালো । আমি ড্যানিয়েল । এখানেই একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে জব করি । তা কোথায় কোথায় যাবে বলে ঠিক করেছ ?

আমি- আমি তো যাবো হোয়া বাচু জঙ্গলে ।

ড্যানিয়েল- কিহ্ ! হোয়া বাচু জঙ্গলে ! তুমি কি জানো ওখানে যাওয়াটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ?

আমি- হ্যাঁ, আমি জানি । ওখানে যতজন প্রবেশ করেছে তারা অনেকেই ভিতরেই কোথাও হারিয়ে গেছে, আর যারা ফিরে আসতে পেরেছে তারাও ফিরেছে প্রচুর জ্বর, গায়ে ফোস্কা পড়া বা পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে ।

ড্যানিয়েল- সবকিছু জানার পরও যাবে ঐ জঙ্গলে ? এতোটা রিস্ক নেওয়া কি ঠিক হবে ?

আমি- কথায় আছে না ? নো পেইন, নো গেইন । অজানাকে জানতে হলে একটু রিস্ক তো নিতেই হবে । আর আমি যখন এয়ারপোর্ট থেকে বের হচ্ছিলাম, সেখানে দেখেছিলাম একটা বাঁদুড়ের মুর্তি করা । ওটার কারণ কি ?

ড্যানিয়েল- আমাদের রোমানিয়া যতটা রোমানিয়া নামে পরিচিত, তার থেকেও বেশি পরিচিত কান্ট্রি অব ভ্যাম্পায়ার বা ড্রাকুলার দেশ নামে ।

আমি- এখানে কি আগে সত্যি সত্যিই ড্রাকুলারা বসবাস করতো ?

ড্যানিয়েল- ড্রাকুলা সত্যিই এদেশে বসবাস করতো কিন্বা বাস্তবেই ড্রাকুলার মত কোনো প্রাণী আদ্যও এই পৃথিবীতে আছে কি না সেটা বলতে পারছি না । আমি কোনোদিন দেখিনি কোনো ড্রাকুলাকে ।

আমি- তারমানে আপনার মতে ড্রাকুলা নামে কোনো প্রাণীই নেই বাস্তবে ।

ড্যানিয়েল- হয়তো থাকতেও পারে । কিন্তু আমি কখনো দেখিনি তেমন কিছু ।

আমি- আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, ড্রাকুলা নামের একটা প্রাণী পৃথিবীতে ছিলো কিন্বা এখনো আছে ?

ড্যানিয়েল- আমি যেহেতু দেখি নি এরকম কোনো প্রাণীকে এবং পৃথিবীতে যে তাদের কোনো অস্তিত্ব আছে সেটাও কেউ প্রমাণ করতে পারে নি । তাহলে বিশ্বাস করি কিভাবে বলো তো । আর তাছাড়া অতীতে যদি এরকম কোনো প্রাণী থাকত তবে ডাইনোশরের মত ড্রাকুলারও কঙ্কাল বা জীবাংশ পাওয়া যেতো । যেহেতু এরকম কিছুও পাওয়া যায় নি, তাহলে বিশ্বাস করি কিভাবে ? তবে হ্যাঁ, যদি কখনো এরকম কোনো প্রাণীর সাথে সাক্ষাত হয় তাহলে বিশ্বাস করবো ।

আমি- তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, ড্রাকুলা আসলেই পৃথিবীতে আছে এটা প্রমাণ করতে হলে তাকে আপনার সামনে নিয়ে আসতে হবে কিন্বা কোনো পাকাপোক্ত প্রমাণ দিতে হবে । তাই তো ?

ড্যানিয়েল- একদম তাই । এরকম একটা অবাস্তব কল্পনাকে তো আর এমনি এমনিই বিশ্বাস করতে পারি না ।

আমি- একটা বিষয় বুঝতে পারছি না, এতো সুন্দর প্রকৃতির দেশকে ভ্যাম্পায়ারের দেশ বলার কারণটা কি ?

ড্যানিয়েল- সেটাতো আমিও বুঝতে পারি না, প্রশ্নটা আমার মাঝেও জাগে মাঝেমধ্যে ।

.

এভাবেই সমস্ত পথ গল্প চললো আমাদের মাঝে । প্রায় ছয় ঘন্টা পর ট্রেন পৌঁছালো ট্রান্সসিলভানিয়ার ক্লাজ নাপোকা রেলস্টেশনে । রেলস্টেশনের পাশেই ড্যানিয়েলের বাসা, সে ছাড়লো না এতো রাতে । দেখলাম সত্যিই অনেক রাত হয়েছে, আর অচেনা জায়গায় থাকার ব্যাবস্থা করাও মুশকিল । ভাবছিলাম শুধু ড্যানিয়েলই ফ্রেন্ডলি টাইপের, কিন্তু তার পরিবারের সাথে সাক্ষাত করার পর আমার ধারণা ভুল প্রমানিত হলো । এদের সাথে পরিচিত হয়ে মনে হলো আমি বাংলাদেশেই আছি । রোমানিয়ার মানুষগুলোও বাংলাদেশের মানুষের মতই ফ্রেন্ডলি ।

রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে প্রচুর ঘুম পাচ্ছে আমায় । এতক্ষণে মনে পড়লো, বাংলাদেশে এখন প্রায় ৩টা বাজছে ঘুম পাওয়াটাই স্বাভাবিক । কিন্তু এখানে বাজছে মাত্র রাত ১১টা ।

ড্যানিয়েল আমার শোবার জন্য সকল বন্দবস্ত করে দিলো । বিছানা গা-টা এলিয়ে দিতেই চলে গেলাম ঘুমের রাজ্যে ।

.

.

[][][][][] চলবে [][][][][]

আবার সেই জঙ্গলে — সব পর্ব

মন্তব্যসমূহ