বৃষ্টিভেজা মধ্যরাত
মোঃ মিসাদ আলী
বৃষ্টিভেজা মধ্যরাত।
মুষলধারে
বৃষ্টি পড়ছে জানালার কাচে, একটানা বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে যেন রাতটা আরো
নিঃসঙ্গ হয়ে উঠেছে। দূরে কোথাও বজ্রপাতের আলো অল্পক্ষণের জন্য ঘরটাকে
আলোকিত করে আবার আঁধারে ঢেকে দিচ্ছে, ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা ছুঁইছুঁই।
ঘুমের ঘোরে হঠাৎ চমকে উঠল আলফী। কিছু একটা
অস্বাভাবিক অনুভব করছিল সে। একটা ভারী নীরবতা, যেন ঘরের প্রতিটি কোণায়
কিছু লুকিয়ে আছে। হঠাৎই দরজায় ঠক ঠক শব্দে কেঁপে উঠল বুকটা।
-“আলফী! দরজা খোল, আমি তারেক!”
বাইরে থেকে আতঙ্কমিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
চেনা কণ্ঠ।
তবু ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল। এমন রাতে, এমন বৃষ্টির মধ্যে তারেক! তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে দরজার কাছে এসে আলফী ধীরে ধীরে কপাট খুলল।
কিন্তু... বাইরে কেউ নেই!
সামনের বারান্দা ফাঁকা, শুধু
বৃষ্টির ঝাপটা আর দমকা ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে আঘাত করল। অন্ধকারের মধ্যে
ছাদের কিনারা থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
অবাক চোখে চারপাশে তাকিয়ে রইল আলফী।
না, ভুল শুনেনি সে। ঠিকই তারেকের কণ্ঠস্বর ছিল।
হঠাৎ
চোখে পড়ল দরজার সামনে ভেজা স্পষ্ট পায়ের ছাপ। পাশে পড়ে আছে একজোড়া জুতা,
যেটা তারেকেরই। পায়ের ছাপগুলো বাগানের দিকেই চলে গেছে, তারপর মিলিয়ে গেছে
কাদামাটির ভেতর।
আলফীর বুক ধকধক করে উঠল। তবুও কোনো অজানা
টানে ছাতা হাতে বেরিয়ে পড়ল সে। পেছনের বাগানে বৃষ্টির শব্দে চারদিক ভরে
গেছে, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, ভেজা পাতার গন্ধ, আর এক অজানা শূন্যতা।
তারপর... সবকিছু মিলিয়ে গেল বৃষ্টির গর্জনে
পরদিন সকাল
সকালের পত্রিকার শিরোনামে খবর, “পুলিশ স্টেশনের সামনে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার”।
মৃতদেহের মুখটা কোনো ভারী বস্তু দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। পকেটে কোনো পরিচয়পত্র নেই। শুধু হাতে একটা ঘড়ি, আঙুলে একটি আংটি।
সেই আংটি, সেই ঘড়ি, চোখের জল ফেলে সুমন সাহেব নিশ্চিত করলেন, এটা তাঁর ছেলে তারেকেরই দেহ।
আর আলফী?
সে নিখোঁজ।
পুলিশের ধারণা, বাল্যবন্ধু আলফীই তারেককে
হত্যা করে পালিয়েছে। তার ছবিসহ নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে গেল সংবাদপত্রে, থানায়
থানায়, পোস্টারে পোস্টারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু মুছে গেল।
মানুষ ভুলে গেল তাদের কথা, বৃষ্টির মতোই হারিয়ে গেল তারা এক অজানা স্রোতে।
পাঁচ বছর পর
বছর ঘুরে গেছে অনেক। সুমন সাহেব এখন ভীষণ অসুস্থ, দুর্বল শরীর নিয়ে শহরের হাসপাতালে ভর্তি।
এক
বিকেলে তাঁকে হুইল চেয়ারে করে ওয়ার্ডে তোলা হচ্ছিল। হঠাৎ পাশের করিডর দিয়ে
কয়েকজন হাসপাতাল কর্মী এক মৃতদেহ ঠেলাগাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিল মর্গের দিকে।
সেই মুহূর্তে এক ঝাপটা বাতাস এলো। মৃতদেহের ওপরের সাদা কাপড়টা উড়ে গিয়ে মুখের অর্ধেক উন্মুক্ত হয়ে পড়ল।
সুমন সাহেব থমকে গেলেন।
দীর্ঘশ্বাস গিলে, কাঁপতে কাঁপতে তাকিয়ে রইলেন নিথর মুখটির দিকে।
সে মুখ, তারেকের মুখ।
কিন্তু…
তাহলে পাঁচ বছর আগে কাকে কবর দেওয়া হয়েছিল?
আর আলফী?
দু’চোখে প্রশ্নচিহ্ন এঁকে নীরবে বৃষ্টি শুরু হলো জানালার বাইরে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন