একটি খুন

 

একটি খুন

মোঃ মিসাদ আলী

বিবাহের ছয় মাস পেরিয়েছে। তবে মিমের মনে আর সিফাতের প্রতি সেই প্রথমদিনের উষ্ণতা নেই। বাহির থেকে দেখলে তাদের জীবন সাজানো, চাকরি, গাড়ি, সব মিলিয়ে খুশি। কিন্তু ঘরের দরজার ভেতর দু’হৃদয়ের মাঝে একটা অদৃশ্য দূরত্ব গজিয়েছে। মিম বোঝে, সিফাত বদলে গেছে, কথায়, আচরণে আগের প্রকাশ নেই, আবেগ শুকিয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

কয়েক সপ্তাহ আগে সিফাত গাড়ির জন্য একজন চালক নিয়েছিলেন, নাম রকি। বয়স কদাচিৎ পঁচিশের ঘেঁষা, দরিদ্র পটভূমির ছেলে। বাবা মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসেছে। রকি শান্ত, কর্মঠ, প্রথমে সে শুধু গাড়ি চালাত, অফিসে সিফাতকে পৌঁছে দিত, সন্ধ্যায় গাড়ি তুলে বাড়ি ফিরত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে আর মিমের মাঝে সাধারণ আড্ডার বাইরে গোপন আলাপ পাততে থাকে।

একদিন নিভৃত মুহূর্তে মিম হঠাৎ বলল,
“রকি, তুমি কি আমার জন্য বিষ এনে দিতে পারবে? আমাদের পথের কাঁটাগুলো আর রাখতে চাই না। ডিভোর্স হলে তো আমি সিফাতের সম্পদের সুবিধা পাইতে পারব না; কিন্তু যদি ওর মৃত্যু ঘটে, তাহলে সব কিছু আমারই হবে।”

রকি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, একটি চুপচাপ ‘হ্যাঁ’ যেখানে ভেঙে পড়া মানুষের সীমাবদ্ধতা লুকানো ছিল। সিদ্ধান্ত নেবার ছোটো মুহূর্তটা পরে বড় অপরাধে রূপ নিল।

কয়েক দিনের মধ্যে পরিকল্পনা কার্যকর করার একটি সুযোগ এল। এক সন্ধ্যায় সিফাত ও মিম সাধারণ ডিনার করল, ডিম ভাজা, সবজি, আর হালকা টক-দই। সিফাত ডিম ভাজা খেয়ে ঘুমোতে গেল। ঠিক তখনই রকি চুপচাপ ঘরে ঢুকল।

“কাজটা হয়ে গেছে?” সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” মিম বলল শান্ত কণ্ঠে, “ও ডিম ভাজা পুরোটা খেয়ে ফেলেছে।”
রকির গলায় অদ্ভুত করে কাঁপন চলে এলো,“তাহলে তুমি কী খেয়েছ?”
“আমি সবজি খেয়েছি,” মিম বলল নির্দ্বিধায়।

রকির মুখ শুকিয়ে গেল। কোনোরকম বেগে সে বাইরে ছুটে গেল, যেন কোন ভয় তাকে তাড়া করছে। মিম আর সিফাতের মধ্যে রাতটি অচিরেই নিয়মিত নিস্তব্ধতায় ভরে গেল, কেউ বুঝতে পারল না কিভাবে নিপুণভাবে বিষ প্রয়োগ করা হলো।

পরের সকালে সিফাত ঘুম থেকে উঠে রুম থেকে বের হতেই মেঝেতে মিমের নিথর দেহ দেখতে পায়। মুখে অচেনা প্রশান্তি, চোখ বন্ধ। রক্তের কোনো চিহ্ন নেই, শরীর একদম ফ্যাকাশে। 

পুলিশে খবর পৌঁছায়, তল্লাশি হয়, বিস্তারিক পরীক্ষায় মিমের দেহে বিষক্রিয়ার লক্ষণ পাওয়া যায়। তদন্ত শুরু হয়, সন্দেহের ওপর পড়তে থাকে রকি, তার আচরণ, চলাফেরা, বাহিরের অপ্রতিশ্রুত চেহারা। তবে গল্পের এই পর্যায়ে কিছু প্রশ্ন ঝুলে থেকে যায়,
কতটা পরিকল্পিত ছিল এই হত্যা? রকি একা কি সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছিল? মিম কি শুধু প্রতিশোধের উপায় দেখতে পেয়েছিল, নাকি অন্য কিছুর প্রভাবও ছিল? আর সিফাত? সে কি অফুরন্ত নির্দোষ, নাকি তারও কোনও গোপনত্ব ছিল?

পাঠককে এভাবেই রেখে দেয়া হলো, উত্তরগুলো ধীরে ধীরে আলোচনায়, তদন্তে, আর মানুষের মুখে মুখে মিলবে, যখন প্রতিটি ছায়া উন্মোচিত হবে।

মন্তব্যসমূহ