চার নাম্বার শিকার
মোঃ মিসাদ আলী
ড্রয়ার খুলে ছুরিটা হাতে নিলাম। ছোট, কিন্তু ভয়ানক ধারালো। আলোয় এর ফলার ওপর একচিলতে ঝিলিক, যেন শয়তানের ঠোঁটের হাসি। ধীরে ধীরে সেটা পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম।
চার নাম্বার শিকার, শেষ কাজ।
এরপর আমার মৃত্যু হলেও কোনো আফসোস থাকবে না, বরং মুক্তি মনে হবে।
তাসফিয়া ঘুমিয়ে আছে বিছানায়। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া চাঁদের আলো তার মুখে পড়েছে, শান্ত, নিশ্চুপ, নিষ্পাপ। কিন্তু আমি জানি, এই মুখই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতারণা।
একদিন সে বলেছিল,“তোমাকে ছাড়া আমার জীবন কল্পনাই করতে পারি না।”
এখন সেই মুখ অন্য কারও ঘরে, অন্য জীবনের মালিক।
প্রতিশোধ আমার রক্তে মিশে গেছে।
তার বাবা, মা, আর স্বামী, তিনজনই মারা গেছে আমার হাতে।
প্রতিটি মৃত্যু আমি এমন নিখুঁতভাবে ঘটিয়েছি যে কেউ বুঝতেও পারেনি সেটা হত্যাকাণ্ড।
আজ শেষ অধ্যায়।
আজ তাসফিয়া।
তার ঘুমের ভেতর নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে মুখে কাপড় চেপে ধরলাম, তারপর শক্ত করে বেঁধে ফেললাম হাত-পা। হঠাৎ তার চোখ খুলে গেল—আতঙ্কে ভরা দৃষ্টি, দমবন্ধ চিৎকারের চেষ্টা। কিন্তু মুখে বাঁধা কাপড়ে শব্দ আটকে গেল ভেতরেই।
আমি ছুরিটা তুললাম।
এক মুহূর্তের দ্বিধা, তারপর ব্লেডের ধার ডান হাতের রগ বরাবর চালিয়ে দিলাম।
রক্তের গন্ধ, গরম ধারা, আর বিছানায় লাল দাগ—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত নেশায় ভরে উঠল ঘরটা। তবু বুকের বাঁ পাশে কেমন একটা অচেনা ব্যথা জেগে উঠল।
আমি যাকে মারতে এসেছি, তার জন্যই কেন এই যন্ত্রণা?
আমি ছুরিটা ফেলে দিয়ে তার হাত ধরে রক্ত থামানোর চেষ্টা করছি, কাঁপা কণ্ঠে বলছি,“না... না, আমি এটা চাইনি...”
ঠিক তখনই, একটা ঝাঁকুনি।
চোখ খুলে দেখি, আমি বিছানায় শুয়ে আছি।
তাসফিয়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে, অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
সে বলল,“কি হয়েছে? দুঃস্বপ্ন দেখলে নাকি?”
আমি ঘামেভেজা মুখে চারপাশে তাকালাম।
সবকিছু আগের মতো, পরিচিত ঘর, পরিচিত মুখ।
আজ আমাদের দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী, তাসফিয়া আমার স্ত্রী।
আমি নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম, সে হাসছে।
আর আমি... এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না, আমি জেগে আছি, না স্বপ্নের ভেতরেই বন্দি হয়ে আছি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন