ডাক্তার সাইকো

 

 

ডাক্তার সাইকো

মোঃ মিসাদ আলী

মধ্যরাত।
চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার নিরবচ্ছিন্ন ডাক আর দূরে কোথাও পেঁচার ডাকে বাতাসটা আরও ভয়ানক হয়ে উঠেছে। গভীর জঙ্গলের ভেতর, এক পরিত্যক্ত বাড়ির বন্ধ ঘরে অন্ধকারের মধ্যে টেবিলের ওপর টিমটিম করে জ্বলছে একটা কেরোসিনের বাতি। তার হলদেটে আলোয় ছায়া পড়েছে দেয়ালে, যেন দুলে ওঠা কোনো অশুভ নৃত্য।

চেয়ারে শক্ত করে বাঁধা আলফী ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পেল। মাথাটা ভারী, চোখের সামনে সব ঝাপসা। চোখ মেলে তাকাতেই দেখে, টেবিলের ওপাশে কেউ বসে আছে। তার মুখ অন্ধকারে ঢাকা, শুধু বাতির আলোয় ঝলসে উঠছে হাতে ধরা কাটিং প্লাস, পাশে সারিবদ্ধ কয়েকটি ছুরি, এক ড্রিল মেশিন, আর কিছু অচেনা ধারালো যন্ত্র।

আলফীর বুকের ভেতর ঠকঠক শব্দে কাঁপছে হৃদস্পন্দন। ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে।

গত পনের দিন ধরে এই জঙ্গলটার নামই হয়ে গেছে মৃত্যুর বন।
প্রতিদিন সকালে রাস্তার ধারে মিলছে টুকরো টুকরো মানুষের দেহাংশ। কেউ বলে—জঙ্গলে জ্বীন থাকে, কেউ বলে কোনো অশরীরী প্রতিশোধ নিচ্ছে। এমনকি পুলিশও সাহস করে রাতের বেলায় প্রবেশ করে না এখানে।

কিন্তু আলফী আর সিহাব, দু’জনই সাংবাদিকতার ছাত্র। সংবাদপত্রে একের পর এক খবর পড়ে কৌতূহল দমাতে পারেনি তারা। এক সন্ধ্যায় তারা বেরিয়ে পড়ে তদন্তে। তারপর? তারপর আর কিছুই মনে নেই আলফীর। চোখ খুলে দেখল সে এই ঘরে বন্দি!

হঠাৎ টেবিলের ওপাশের মানুষটি উঠে দাঁড়াল।
তার চলার শব্দ ভারী, ধীর।
সে টেবিল থেকে কাটিং প্লাস তুলে নিলো, ধারালো ধাতুর ঝলক আলোর নিচে বিদ্যুতের মতো ছুটে গেল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আলফীর দিকে।

আলফী প্রাণপণে বাঁধন খুলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু ব্যর্থ। নিস্তব্ধ ঘরে তার নিঃশ্বাসের শব্দই কেবল শোনা যাচ্ছে। চোখ তুলে দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল আলো-আঁধারের খেলার ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক অবয়ব, চেনা, কিন্তু ভয়ানকভাবে নীরব।


পরদিন সকাল

জঙ্গলের বাইরে আবারও পাওয়া গেল এক মৃতদেহ।
তবে এবার আগের মতো টুকরো টুকরো নয়, পুরো দেহ অক্ষত, শুধু মুখে এক রহস্যময় শান্তির ছাপ।

লোকজন ভিড় করে বলাবলি শুরু করল,
“আরেহ! এ তো রিফাত ডাক্তার! কে মারলো তাকে?”

রিফাত ডাক্তার, যিনি ছিলেন স্থানীয় মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, মানুষ তাঁকে ডাকতো “ডাক্তার সাইকো” নামে।

সবাই হতভম্ব, কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
আর ঠিক তখনই রাস্তার ধারে বাইকে চেপে চলে যাচ্ছে দু’টি তরুণ মুখ।
আলফী আর সিহাব।

সিহাবের ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি, আলফীর চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
বাইকের শব্দ মিলিয়ে গেল দূর অন্ধকারে,
শুধু বাতাসে রয়ে গেল তাদের হাসির প্রতিধ্বনি,
যেন কোনো রক্তাক্ত রহস্যের শেষ হাসি।

মন্তব্যসমূহ