আমৃত্যু ভালোবাসি

আমৃত্যু ভালোবাসি

মোঃ মিসাদ আলী

রাত দশটা থেকে ফোন করেই যাচ্ছে স্নেহা, কল ওয়েটিং দেখানোর পরও বারবার চেষ্টা করছে।

আজকে একটা নতুন ফোন আর সিম কিনেছি বাড়ি ফেরার সময়। আমার পুরাতন ফোন দিয়ে নতুন ফোনের করা কল রিসিভ করে রেখে দিয়েছি প্রায় দেড় ঘন্টা হতে চললো, আর দশ মিনিটের মতো আছে এরপর কল কেটে যাবে। হলোও তাই, দশ মিনিটের মাথায় কল কেটে গেল। আর সেই সময় আবার স্নেহার কল, কলটা রিসিভ করবো কি-না সেই দ্বিধা পেরিয়ে উঠতে পারলাম না। বাধ্য হয়ে ফোনটা অফ করে রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।

আমি সিয়াম, অনার্স ফাইনাল ইয়ারে। আর যে বারবার আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল মানে স্নেহা, আমার ক্লাসমেট। পাঁচ বছর হতে চললো আমাদের মাঝের সম্পর্কটার। কিন্তু এখন কেন জানি না, তার প্রতি প্রচন্ড বিরক্তি অনুভব করি। তার সাথে কথা বলতেও ইচ্ছে করে না, না আকর্ষণ অনুভব করি তার প্রতি। কিন্তু স্নেহার সাথে পরিচয়ের ঘটনাটা মনে পড়ে আজও।

কলেজে তখন নতুন উঠেছি, তাও আবার বাসা থেকে সাড়ে চার'শ কিলোমিটার দূরে। এখানে কাউকেই চিনি না, কীভাবে পড়বো, কীভাবে সবকিছু সামলাবো সেই সব চিন্তায় মাথা ভার করে রেখেছে। কয়েকদিন নিয়মিত ক্লাস করার বদৌলতে হোক আর তাদের বন্ধুসুলভ আচরণের জন্যই হোক, শামীম আর রতন নামের দুই বন্ধু পেলাম। তারাও স্থানীয় না, মানে আমার মতো। তাই তিনজনের বন্ধুত্বটা জমে উঠেতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময় রতন হুট করে একটা মেয়ের সাথে রিলেশনে চলে গেল। আমাদের আর পাত্তা দেয় না, আমাদের বন্ধুত্বটাও এতটা ঘনিষ্ঠ হয়নি যে তাকে নিয়ে তেমন ভাববো। তবে এর মাঝে শামীম আর আমার ফ্রেন্ড সার্কেলে একটা নতুন মানুষের আগমন হলো। স্নেহা, প্রথমবার দেখাতেই তার প্রতি অনেকটা আকৃষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম, আর সে যখন আমাদের সাথে মিশতে শুরু করলো তখন আমার অবস্থা পুরো শেষ! তার প্রতি যে আমার কিছু একটা ফিলিংস আছে সেটা যে কেউ দেখলেই বুঝে ফেলবে, শামীমের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটলো না। এতে অবশ্য ভালোই হয়েছিল, ফ্রেন্ডের সাথে আর যাই হোক রিলেশন নিয়ে ঝগড়া করতে হয়নি। আর সেও স্নেহাকে শুধু ফ্রেন্ড হিসেবেই দেখে এসেছে সেই থেকে।

স্নেহাও যে আমার প্রতি দূর্বল সেটা তার আচরণে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। তবে আমি এত তাড়াতাড়ি কিছু করতে চাইছিলাম না, তাই দুজনের মাঝের গভীরতা বাড়ালাম, জানলাম একে-অপরকে। এইচএসসি পরীক্ষার শেষ দিন প্রপোজ করলাম তাকে, উত্তরটা আমার আগে থেকে জানাই ছিল। সেই থেকে আমাদের দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। কিন্তু এই কিছুদিন থেকে কেন জানি না এমন হচ্ছে।

ঘুম থেকে জেগে বাইরের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, এমন সময় শামিমের ফোন পেলাম।

-কোথায় আছিস?' শামীমের কন্ঠে আক্ষেপ বোঝা যাচ্ছে

-এই তো, বাড়ির পাশের রাস্তায়।

-তুই জানিস? স্নেহাকে আজ দেখতে এসেছে।

-বাহ্, ছেলের বাসা কোথায়? আর কী করে?

-কী বলছিস এসব? তুই ঠিক আছিস তো?

-আমার আবার কী হবে? আমি একদম ঠিক আছি। স্নেহা দেখতে এসেছে তো জানতে চাইবো না?

-তুই এমন কেন করছিস বলতো?

-আবার কী করলাম?

-স্নেহার ফোন রিসিভ করছিস না কেন? জানিস ওর অবস্থা এখন কেমন?

-এসব নিয়ে না ভেবে যদি ছেলেটাকে ভালো লাগে তাহলে বিয়ে করে নিতে বল।

-তুই আধা ঘণ্টা দাঁড়া, আমি আসছি তোর সাথে দেখা করতে।

-আমি গ্রামের বাসায় যাচ্ছি এখন, একমাস পরে ফিরবো।' বলেই ফোনটা কেটে দিলাম।

রুমে ফিরে আবার শুয়ে পড়লাম, জানি না স্নেহাকে দেখতে আসার খবরটা শুনে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ভালো লাগছে না আর, বারবার মনে হচ্ছে ফোন করি। তাই তার নাম্বারটা ব্লক করে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কয়েকটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসছে, কে ফোন করছে সেটা আমার জানা তাই কোনোটাই রিসিভ করছি না।

সাতদিন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা ঘুরে বেড়ানোর পর রুমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই এক সপ্তাহে কারো সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ হয়নি। রুমের দরজাটা খুলতেই ফোন এলো, শামীমের ফোন।

-তুই কাজটা ঠিক করলি না, আমি কোনোদিন তোকে ক্ষমা করবো না।

-তোর এত ফাটছে কেন বুঝছি না।

-আমার ফাটছে কারণ তুই যেমন আমার ফ্রেন্ড, স্নেহাও আমার ফ্রেন্ড। আর আমার ফ্রেন্ডকে কেউ অকারণে কষ্ট দিবে সেটা আমি সহ্য করবো না।

-তোর যখন এত ফাটছে তাহলে তুই বিয়ে করে নে।

-সেই সুযোগ কি আর আছে?' কন্ঠটা হঠাৎ ভারি শোনালো তার।

-কেন? তুই চাইলেই পারিস।

-আমি চাইলেই সব হবে না। আজ তার বিয়ে হয়ে গেছে।' কথাটা শুনে কেন জানি না, আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। কিন্তু আমি তো আর তার প্রতি আকৃষ্ট না, বিরক্তি লাগে তবুও কেন তার বিয়ের কথা শুনে আমার কষ্ট হচ্ছে বুঝছি না। মনে হচ্ছে হারিয়ে ফেলেছি আমার নিজের শরীরের কোনো এক অঙ্গকে। শামীম বলতে থাকে' আজ কবুল বলার আগে পর্যন্ত তোকে ফোন করেছে। শুধু একটা আশায়, তুই তাকে নিজের করে নিবি। কিন্তু কবুল বলার সময় আর কারো সাথে কথা বলেনি, যেন সে সব ভুলে গেছে। সবাই ভাবছিল তেমন কিছু হয়নি, কিন্তু যখন তার কান দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসলো তখন সবাই হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করলো। মাঝ রাস্তায় সে আমাদের ছেড়ে চিরকালের মতো চলে গেল। শুধু তোর জন্য আমি আমার একটা বন্ধুকে হারালাম।

ওর কোনো কথা আর আমার মাথায় ঢুকছে না, মাথার ভেতর শুধু তার হাসিমুখ দেখতে পাচ্ছি, তার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার চোখের সামনে এসে পড়েছে। আর চারিদিক থেকে ভেসে আসছে, 'শুধু তোর জন্য আমার একটা বন্ধুকে হারালাম।'

এমন সময় ঘুম ভেঙে গেল, ফোনটা চালু করে দেখি রাত চারটা বাজে। বাইরে বেরিয়ে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছি, আর একটু দূরে স্নেহাদের বাসা। স্নেহার রুমে দিকে তাকাতেই নজরে এলো, জানালার গ্রিলে মাথা লাগিয়ে বসে আছে সে। আমি দাঁড়িয়ে আছি তার রুমের নিচে, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছি তাকে। চাঁদের আলোর পরীর চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছে না। এমন একটা মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট না হওয়ার কারণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না, তার দিকে হাজার বছর তাকিয়ে থাকলেও বিরক্তি বোধ হবার কথা নয়। কিন্তু জীবনের বিভিন্ন চাপের প্রভাব প্রিয় মানুষটার ওপরই পড়ে। তবে একটা প্রতিজ্ঞা করলাম, বেশি বিরক্তি লাগলে তার দিকে তাকিয়ে থাকবো, তবুও কখনও ইগনোর করবো না।

ফোনটা পকেট থেকে বের করে ফোন করলাম, ঘুমিয়ে পড়েছিল, তবে একবার রিং-এর শব্দ পেয়েই ফোন রিসিভ করে নিলো।

-ভালোবাসি তোমাকে, শত সমস্যার মাঝেও আমি তোমাকেই ভালোবাসি এবং আমৃত্যু ভালোবাসি। চলো বিয়ে করে নিই।

-কী হয়েছে তোমার?' অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে সে।

-কিছু না, বিয়ে করবে না?

-বিয়ে তো করবোই, তবে কী হয়েছে, বলো।

-তাহলে জানালার বাইরে তাকাও...

#সমাপ্ত

মন্তব্যসমূহ