ডায়েরির পাতায়

ডায়েরির পাতায়

মোঃ মিসাদ আলী

আজ দুই বছর পূর্ণ হলো তাসফিয়াকে প্রথম দেখা। এই দুই বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে, বদলে গেছে মানুষগুলো। কিন্তু নিজেকে বদলানোর কোনো চেষ্টাও করিনি মিসাদ। সুখের মুহূর্তগুলো খুব বেশি স্থায়ী হয় না। ঘড়ির কাঁটা হয়তো প্রতিযোগিতা শুরু করে, কতটা জলদি পার হওয়া যায়। আর কষ্টের মুহূর্তগুলোর ক্ষেত্রে একদম ভিন্ন। একটা মিনিট যেন দিনের চেয়েও বড় বলে মনে হয়।

মিসাদ যেদিন প্রথম তাসফিয়াকে দেখেছিল সেই দিনটার কথা ভীষণ মনে পড়ছে তার। সেই বর্ষার গোধূলী বেলায় কাক ভেজা হয়ে রাস্তার পাশের একটা টং দোকানের খড় দেয়া ছাউনীর নিচে আশ্রয়ের জন্য ছুটে গিয়েছিল মিসাদ। জায়গাটা তার বাসা থেকে খুব একটা দূরেও না, আর মাত্র মিনিট দশেক পায়ে হাঁটলেই তার বাড়ি। কিন্তু এতটুকু আসতেই বৃষ্টির বেগ কিছুটা বেড়ে গিয়েছে। ছাউনীর নিচে কেউ নেই দেখে কিছুটা আশ্বস্থ হলো সে, অন্তত সিগারেটে কয়েকটা সুখটান দেয়া যাবে। সিগারেট আর ম্যাচটা পকেট থেকে বের করার আগেই কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেলো সে। মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হয়ে ওগুলো আবার পকেট পুরে নিলো।

মাথার ওপর কলাপাতা দিয়ে ভিজতে ভিজতে সেই ছাউনীর নিচে আশ্রয় নিলো তিন মেয়ে। বয়স খুব একটা বেশি না, হয়তো আঠার কিংবা উনিশ। যদিও মিসাদের যে খুব একটা বয়স হয়েছে তা কিন্তু না, তার বয়সও একুশ চলছে। যেহেতু তারা জুনিয়র, তাই তাদেরকে তেমন পাত্তা না দিয়ে পকেট থেকে আবার সিগারেট আর ম্যাচটা বের করে সিগারেটে লম্বা একটা টান দিলো। এতক্ষণে কিছুটা শান্তি শান্তি লাগছে তার মনে। চোখ বুজে সেই সুখ অনুভব করছিল সে, হঠাৎ কারো থাপ্পড়ের কারণে বাস্তবে ফিরে এলো।

ব্যাথা পেয়ে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে, সামনে দাঁড়িয়ে আছে অসম্ভব সুন্দর এক তরুনী। হালকা ভাবে ভিজে আছে, চুল বেয়ে বৃষ্টির কণাগুলো ঝরে পড়ছে ধীরে ধীরে।

-এতটুকু কমন সেন্স নেই আপনার?' রাগী গলায় বলে চলেছে মেয়েটি' দেখছেন এখানে কয়েকজন মেয়েও আছে, তবুও সিগারেট খাচ্ছেন! দেখে তো ভদ্র ঘরের ছেলে বলেই মনে হয়, কিন্তু স্বভাব এত খারাপ কেন আপনার?

কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে আটকে নিলো মিসাদ। এক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে মানব রুপধারী অপ্সরীটির দিকে। এটা দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়েই তার সহপাঠীদের কাছে ফিরে গেল। সেখানে গিয়েও শান্তি নেই, তার সহপাঠীরা এত ভালো একটা সুযোগ হাতছাড়া করার পাত্রী নয়। প্রথম থেকেই যে তাসফিয়া ছেলেটার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল সেটা তাদের নজর এড়িয়ে যায়নি। তিনজনের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বৃষ্টির মাঝেই দৌড় দিলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। মিসাদ শুধু আহত চোখে চেয়ে থাকল মেয়েটির চলে যাওয়ার পথের দিকে। মনের মধ্যে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নতুন শিহরণ জেগে উঠেছে তার, যা আগে কখনও অনুভব করেনি সে।

প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল মেয়েটার আর দেখা নেই। সারাক্ষণ শুধু তার কথ ভাবতে ভাবতে কোনো কাজে মন বসাতে পারছে না সে। হটাৎ করেই দেখা হয়ে গেল রাস্তার মাঝে।

অনেক মানুষের ভীড় দেখে এগিয়ে গিয়েছিল সে। সেখানে গিয়ে দেখে, কেউ একজন পড়ে আছে রাস্তায়, রক্তে ভিজে গেছে তার আশেপাশের জায়গাগুলো। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে মুখটা দেখে সে। মুখটা দেখেই চারিদিক অন্ধকার হয়ে ওঠে। চোখ খুলে দেখে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে সে। পাশের টেবিলে একটি ব্যাগ রাখা, সেটাতে রক্তের দাগ স্পষ্ট। বিছানা ছেড়ে উঠে ব্যাগটা হাতে নেয়, খুলে দেখে সেটা। একে একে বেরিয়ে আসে বই, খাতা আর একটা ডায়েরি। ডায়েরিটা খুলতেই মেঝেতে পড়ে যায় তার অনেকগুলো ছবি। হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, পরক্ষণে পড়তে শুরু করে ডায়েরিটা। কিছুটা পড়েই আর পড়তে পারে না, চোখ ধরে আসে। ডায়েরির প্রতিটা পাতায় শুধু তার কথা লিখা। মেয়েটি তাকে দুই বছর ধরে অনুসরণ করছিল।

সমাপ্ত

মন্তব্যসমূহ